শীতকালীন টমেটোর চারা উৎপাদন প্রযুক্তি

Posted: December 22, 2013 in কৃষি

বাংলাদেশে টমেটো অতি জনপ্রিয় শীতকালীন সবজি। টমেটোর ভালো ফলন পেতে হলে সঠিক জাত, ভালো বীজ, সঠিক সময়, ভালো ব্যবস্থাপনার মাimages1ধ্যমে চাষ করতে হবে। ভালো বীজের বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চফলনশীল, পরিষ্কার, পোকামাকড় ও রোগমুক্ত, সম আকারের, পুষ্ট, উজ্জ্বল রঙের ও স্বাভাবিক দানা এবং কমপক্ষে শতকরা ৮০ ভাগ গজানোর ক্ষমতাসম্পন্ন ও ভালোভাবে সংরক্ষিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত শীতকালীন টমেটোর জাতগুলোর মধ্যে হলো বারি টমেটো-২ (রতন), বারি টমেটো-৩, বারি হাইব্রিড টমেটো-৫, বারি হাইব্রিড টমেটো-৬ ও বারি হাইব্রিড টমেটো-৭। এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির জাতের মধ্যে মিন্টু সুপার, হাইটম, সালামত ও আনুখি অন্যতম। আধুনিক পদ্ধতিতে শীতকালীন টমেটোর চারা উৎপাদন কলাকৌশলগুলো হলো বীজতলার স্থান নির্ধারণ, বীজতলা তৈরি, বীজতলা মাটি শোধন, বীজ শোধন, বীজ বপন, চারার যত্ন, নেট দিয়ে বীজতলা ঢাকা, দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ, বীজতলায় চারার রোগ দমন, চারার কষ্টসহিষ্ণুতা বর্ধন ও মূল জমিতে চারা রোপণ।
বীজতলার স্থান নির্ধারণ : ছায়াবিহীন, পরিষ্কার এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থানে বীজতলা করা প্রয়োজন। বীজতলার মাটি বেলে দো-অাঁশ বা দো-অাঁশ এবং উর্বর হওয়া উচিত। বেলে মাটি বেশি হলে কাদা মাটি, গোবর বা কম্পোস্ট মিশিয়ে অথবা অতিরিক্ত কাদা মাটি হলে বালু, কম্পোস্ট বা গোবর মিশিয়ে মাটির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের উপযোগী করে বীজতলার মাটি উন্নত করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করতে হলে বীজতলা যত দূর সম্ভব ক্রেতাদের কাছাকাছি এবং যোগাযোগসম্পন্ন স্থানে স্থাপন করা উচিত।
বীজতলা তৈরি : একটি আদর্শ বীজতলার দৈর্ঘ্য ৩ মিটার, প্রস্থ ১ মিটার এবং উচ্চতা ১০-১৫ সেন্টিমিটার। বীজতলা উত্তর-দক্ষিণে লম্বা হলে সব চারা সমভাবে সূর্যালোক পায়। বীজতলার মধ্যভাগ সামান্য উঁচু হওয়া বাঞ্ছনীয়, এতে বীজতলায় পানি জমে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। পাশাপশি দুটি বীজতলার মধ্যে কমপক্ষে ৬০ সেন্টিমিটার ফাঁকা স্থান রাখতে হবে। বীজ বপনের কয়েক দিন আগে বীজতলার মাটি ২০-২৫ সেন্টিমিটার গভীর করে চাষ করতে হবে এবং মাটি ঝুরঝুরা ও ঢেলা মুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সবজি কেন্দ্রের তথ্যানুসারে বীজতলা তৈরির উপাদান হিসেবে বেলে দো-অাঁশ মাটি ৩ ভাগ, ধানের তুষ ১ ভাগ, পচা গোবর ১ ভাগ ও মোটা বালু ১ ভাগ ব্যবহার করতে হবে। মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে প্রতি আদর্শ বীজতলায় ১০০ গ্রাম টিএসপি সার মেশাতে হবে বীজ বপনের এক সপ্তাহ আগে।
বীজতলার মাটি শোধন : বীজ বপনের আগে বীজতলার মাটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে শোধন করে নিতে হবে। এত মাটিবাহিত রোগ ও পোকামাকড় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দমন হয়। সৌরতাপ, জলীয় বাষ্প ব্যবহার, ধোঁয়ার মাধ্যমে, রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ফরমালডিহাইড ব্যবহার করে, কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে ও পোল্ট্রি রিফিউজ ব্যবহার করে বীজতলার মাটি শোধন করা যায়। এর পরও যদি কোনো রোগ থেকে থাকে যেমন কৃমি দমনের জন্য মাটিতে ফুরাডান শতাংশে ৫০ গ্রাম হারে এবং ব্যাকটেরিয়া জীবাণুর জন্য বিস্নচিং পাউডার শতাংশে ৫০ গ্রাম হারে বীজ বপনের এক সপ্তাহ আগে প্রয়োগ করতে হবে।
বীজ শোধন : টমেটোর বীজ বীজতলায় বপনের আগে প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম প্রোভেক্স বা ক্যাপটান বা ব্যাবিস্টিন ব্যবহার করে বীজ শোধন করা যায়। বীজ বপনের ৪ ঘণ্টা আগে প্রয়োজনমতো পানিতে বীজ ভিজিয়ে রাখা এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ ওই পানিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। বীজ বপনের ২ ঘণ্টা আগে বীজের পানি সেঁকে বীজকে ঝরঝরা করে তারপর বীজতলায় বপন করা হয়। বীজ শোধনের ফলে চারার বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শোধনকৃত পানি বীজতলার মাটিতে প্রয়োগ করা যায়।
বীজ বপন : বীজতলায় সারি করে বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে ৪ সেন্টিমিটার দূরে দূরে কাঠি দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। শুকনা মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটির চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মাটির জো অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি আদর্শ বীজতলায় ৫০ গ্রাম সুস্থ বীজ বুনতে হয়। এই হিসাবে এক হেক্টর জমির জন্য ২০০ গ্রাম বীজ বুনতে ৪টি বীজতলার প্রয়োজন।
চারার যত্ন : চারা গজানোর পর থেকে ১০-১২ দিন পর্যন্ত বীজতলায় আচ্ছাদনের মাধ্যমে হালকা ছায়া দ্বারা অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে চারা রক্ষা করা প্রয়োজন। পানি সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যা তবে বীজতলার মাটি দীর্ঘ সময় বেশি ভেজা থাকলে অঙ্কুরিত চারার রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। চারার শিকড় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেলে রোদ কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
নেট দিয়ে বীজতলা ঢাকা : বীজতলায় ৪০-৬০ মেস (প্রতি ইঞ্চিতে ৪০-৬০টি ছিদ্রযুক্ত) নাইলন নেট দিয়ে ঢেকে চারা উৎপাদন করলে চারা অবস্থায়ই সাদা মাছি পোকার দ্বারা পাতা কোঁকড়ানো ভাইরাস রোগ ছড়ানোর হাত থেকে চারাকে রক্ষা করা যায়।
দ্বিতীয় বীজতলায় চারা স্থানান্তরকরণ : বীজ বপনের ১০-১২ দিন পর চারা দ্বিতীয় বীজতলায় ৪ক্ম৪ সেমি দূরত্বে স্থানান্তরিত করা হলে চারার শিকড় বিস্তৃত ও শক্ত হয়, চারা অধিক সবল ও তেজি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, লিকলিকে চারা থেকে দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তরিত চারায় ফলন বেশি হয়। চারা ওঠানোর আগে বীজতলায় পানি দিয়ে ভিজিয়ে এরপর সুচাল কাঠি দিয়ে শিকড়সহ চারা ওঠাতে হয়। ওঠানো চারা সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় আদর্শ বীজতলায় লাগাতে হয়। বাঁশের সুচাল কাঠি বা কাঠের তৈরি সুচাল ফ্রেম দ্বারা সরু গর্ত করে চারা গাছ লাগানো হয়। লাগানোর পর হালকা পানি দিতে হবে এবং বৃষ্টির পানি ও প্রখর রোদ থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা চাটাই দ্বারা ঢেকে দিতে হবে। এভাবে এক হেক্টর জমির টমেটো চারা তৈরি করতে ২২টি আদর্শ বীজতলার প্রয়োজন হয়।
চারা রোপণ : চারার বয়স ৩০-৩৫ দিন অথবা ৪-৬ পাতা বিশিষ্ট হলে জমিতে রোপণ করতে হবে। বীজতলা থেকে চারা অত্যন্ত যত্নসহকারে তুলতে হবে যেন চারার শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং কিছু মাটিসহ চারা ওঠাতে হবে। এ জন্য চারা তোলার আগে বীজতলার মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। বিকালের পড়ন্ত রোদে চারা রোপণ করাই উত্তম এবং লাগানোর পর গোড়ায় হালকা সেচ প্রদান করতে হবে। চারা লাগানোর কয়েক দিন পর পর্যন্ত গাছে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে।

লেখক : ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর, আন্তর্জাতিক সবজি গবেষণা কেন্দ্র, যশোর

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s