হিজড়াদের জীবন ! চাই সকলের সহযোগিতা

Posted: October 14, 2013 in Uncategorized

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। এই মানুষের জন্ম পৃথিবীতে দুই শ্রেণিতে_ নারী ও পুরুষ। এ দুই শ্রেণির বাইরে সৃষ্টিকর্তার আরেক সৃষ্টি হিজড়া মানুষ। এরা নারীও নয় আবার পুরুষও নয়। এরা নারী ও পুরুষের দুই অঙ্গের শারীরিক গঠনে আরেক মানুষ। হিজড়াদের হাত-পায়ের গঠন এবং কণ্ঠস্বরimages পুরুষের মতো, কিন্তু লিপস্টিক লাগিয়ে, শাড়ি-চুড়ি পরে নারীদের মতো চালচলন। হাঁটাচলা নারীদের মতো কিছুটা ছন্দময়। আকৃতির দিক থেকে এরা পুরুষ-মহিলা দুটোই। নেই এদের সন্তান ধারণের ক্ষমতা, সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতা। এ দুই দিক দিয়েই এরা অক্ষম। মানুষের এ অদ্ভুত জন্মরহস্য যাই হোক, এরাও মানুষ। তবে এদের পরিচিতি রাষ্ট্র ও সমাজে হিজড়া নামে। জীবনপ্রকৃতির নির্মম পরিহাসে ভরা এক অভিশপ্ত জীবন। সেই জীবনে সংসার নেই। তাই স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়ের স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসার আনন্দঘন মুহূর্তগুলো কখনো এদের নয়। তবে অভিশপ্ত এই হিজড়া জীবনে অব্যক্ত বেদনা আছে, আছে জীবনভরা দীর্ঘশ্বাস।
বরগুনার গৌরীচন্না ইউনিয়নের লাকুরতলা গ্রামের বনানী সড়কের প্রবেশমুখে রাস্তার পুব পাশে জীর্ণ কুটিরে পাঁচজন হিজড়ার একটি পরিবার। এদের জন্মস্থান দেশের বিভিন্ন স্থানে। তাদের দলনেতা মৌসুমী নামে এক হিজড়া। বয়স ৩৫ বছর। জন্মস্থান সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। জন্মের পর যখন বুঝতে শিখেছেন এ বাড়ি তার নয় এবং মা-বাবা, ভাই-বোন সবার থেকে তিনি আলাদা, তার জাতের আপনজন অন্য হিজড়া_ তখন তারা কোথায় তা খুঁজতে তিনি পথে নামেন। কালের চক্রে দেখাও হয়ে যায় তাদের সঙ্গে। সেই থেকে আপনজন অন্য হিজড়াদের সঙ্গে তার বসবাস। মৌসুমীর সঙ্গে আলাপ করে তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়। মৌসুমী তার এবং সবার কথা বলতে গিয়ে একসময় কেঁদে ফেলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে করুণ অভিব্যক্তি নিয়ে তিনি বলতে থাকেন_ ‘ভাই, এ সমাজে আমরা অবহেলিত। যার কাছেই যাই না কেন সবাই ধিক্কার দেয়। আমাদের দেখলে সবাই উপহাস করে, তামাশা করে। লেখাপড়ার জন্য স্কুলে গেলে ভর্তি করে না। চাকরির জন্য কোনো অফিসে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, এমনকি কোনো বাসায় ঝিয়ের কাজের জন্য গেলেও হিজড়া বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমাদের কী দোষ, কী অন্যায় করেছি আপনারা বলুন। কেন আমরা সমাজবহির্ভূত? এ পৃথিবীতে নিজস্বতা বলতে আমাদের কিছুই নেই।’ নিত্যদিনের ভরণপোষণ কীভাবে চলে_ এর উত্তরে মৌসুমী বলেন, ‘হাটবাজারগুলোয় হাটের দিনে বিভিন্ন দোকান থেকে চাল, ডাল, লবণ, পেঁয়াজ, মাছ, তরিতরকারির তোলা উঠিয়ে, বিয়েবাড়ি অথবা কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে আমাদের আদলে নাচ দেখালে খুশি হয়ে যে টাকা দেয়, তা দিয়ে আমাদের দিন চলে। এটাও এক ধরনের ভিক্ষাবৃত্তি। এ জন্য অনেক দোকানির কাছ থেকে অকথ্য ভাষায় গালি শুনতে হয়, কিন্তু কী করব আমরা? আমরা অসহায়, তাই বাঁচার তাগিদে অনন্যোপায় হয়ে অপমান সহ্য করে সব কিছুই মেনে নিই। আমরা সবাই গৌরীচন্না ইউনিয়নের ভোটার। প্রতিবার ইউপি নির্বাচনে ভোট দিই। আমার ভোটার নাম্বার ৩৭৭, কিন্তু আজ পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমরা কোনো সাহায্য পাইনি। এই তো সেদিন আমাদের ওয়ার্ড মেম্বারের কাছে ভিজিএফ কার্ডের জন্য গিয়েছিলাম, তিনি একখানা সুন্দর হাসি দিয়ে তাচ্ছিল্যভরে আমাকে তাড়িয়ে দেন। আমরা সব ধরনের সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত। সামাজিকভাবে আমাদের স্বীকৃতি না দিলেও মানবিকতার দিক থেকে সরকার আমাদের যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলেও হয়তো আমরা কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে দুই মুঠো খেয়ে-পরে ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম। অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আমাদের কাজ দিলে তা আমরা করতে পারব, তাতে যে কাজই হোক না কেন। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে আমাদের নিত্যদিন। এ পৃথিবীতে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি এক অভিশপ্ত জীবন নিয়ে। আমরা মানুষ নামের এক ধরনের অবহেলিত জীব। আমি মুসলিম। রোজা রাখি, নামাজ পড়ি, কোরআন তিলাওয়াত করি। যদি পাপ না হতো, তাহলে আত্মাহুতি দিয়ে মনের সব জ্বালা নিবারণ করতাম।’
এ পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষ জন্ম নেয় সৃষ্টিকর্তার দেয়া ভাগ্য নিয়ে। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে ইচ্ছামতো ভাগ্য চেয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করে না। আমিও তো এ পৃথিবীতে একজন হিজড়া হয়ে জন্ম নিতে পারতাম। নিজকে একজন হিজড়া হিসেবে কল্পনা করলে এদের প্রতি একটু হলেও সহানুভূতির টান এসে যাবে। হিজড়ারা আমাদের সমাজবহির্ভূত, কিন্তু আমাদের মতোই এদের শরীরে বইছে তিনটি কণিকাসমৃদ্ধ লাল রক্ত। আঘাত পেলে ওরাও ব্যথিত হয়। স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসা ওদেরও আছে। প্রকৃতির কী এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়ে অভিশপ্ত জীবন নিয়ে এরা জন্ম নিয়েছে এ পৃথিবীতে। অনাহারে-অর্ধাহারে শত কষ্টকে বরণ করে এরা বেঁচে আছে আমাদেরই মধ্যে। সরকার অথবা কোনো দাতা সংস্থা যদি এদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে এরা সৎভাবে দুই মুঠো খেয়ে-পরে বাঁচতে পারত_ এটাই এদের একান্ত প্রত্যাশা। আসুন, আমারা সবাই এদের আপন ভেবে যার যার অবস্থান থেকে মানুষ নামের এই হিজড়াদের প্রতি একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s